বাইন বৃত্তান্ত

ছোটবেলায় আমার নানার বাড়িতে পুলিন নাপিত আসত চুল ছেঁটে দিতে। আর আমার কাছে চুল ছাঁটানোটা ছিল জগতের সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয়। তবে পুলিন দাদুর কাছে চুল ছাঁটতে কোন আপত্তি করতাম না। কারন তিনি চুল ছাঁটার সময় মজার মজার গল্প বলতেন। অনেক গল্প ছিল তাঁর ঝুলিতে। তেমন একটা গল্প ছিল এক কুটনি শাশুড়িকে নিয়ে। পুলিন দাদুর ভাষায়, মহিলার স্বভাব একেবারে বাইন মাছের মত, সারাদিন কাদার মধ্যে সাঁতার কাটবে, ঘুরবে ফিরবে কিন্ত গায়ে এক ফোঁটা কাদা লাগবে না। তো সেই মহিলার ছেলে বিয়ে করে নতুন বউ এনেছে ঘরে। পাড়া প্রতিবেশীরা নতুন বউ দেখতে এসেছে। নতুন বউকে নিয়ে এক এক জন তাঁদের মতামত দিচ্ছেন, মন্তব্য করছেন। কেউ বলছে বাহ্‌ খুব সুন্দর, কেউ বলছে আর একটু লম্বা হলে একেবারে রাজ-যোটক হয়ে যেত, কেউ বলছে হুহ, উত্তর পাড়ার মেয়ে, কেমন হয় কে জানে? ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু যে যা মন্তব্যই করুক না কেন, শাশুড়ির মুখে বারবার এক কথারই প্রতিধ্বনি, মুখ বাঁকা করে টেনে টেনে বলেন, কী জানি বাপু, বাপের বাড়ি থেকে রান্না বান্না কিছু শিখেছে কিনা কে জানে? তবে হ্যাঁ, রাধতে জানে ওই পুবের বাড়ীর মেজ ছেলের বউটা। আহা, হাতে যেন জাদু আছে, ভদ্র ঘরের মেয়ে বলে কথা! কিম্বা কখনও বলছেন, কে জানে স্বভাব চরিত্র কেমন, আমি তো ঠিক জানিনা, তবে হ্যাঁ পাশের বাড়ীর টুটুলের বউকে দেখেছ? যেমন রূপ তেমন গুণ তেমনি তার স্বভাব চরিত্র। তারপরে বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলবেন, কি জানি বাপু, সবার ভাগ্যে তো আর ওরকম ভদ্র ঘরের মেয়ে জুটবে না। কথা বলার ভঙ্গি দেখেই সবাই বুঝে ফেলছে, ছেলের বউকে তার মনে ধরেনি। আসলে তিনি নিজেও জানেন না যে তিনি কি বলছেন – কেন বলছেন, মজ্জাগত অভ্যাস বশতঃ কলের পুতুলের মত একই শীবের-গীত গেয়ে যাচ্ছেন। ওনার এসব কথা শুনে কেউ মুখ টিপে হাসে, কেউবা মাথা নাড়ে, কেউবা আবার তাঁর সুরে সুর মিলিয়ে আরও দু একটা মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছে। দু একজন মহা বিরক্ত হলেও কিছু বলছে না, পাছে আবার যদি খেঁকিয়ে ওঠে, সেই ভয়ে।

তারপরে দিন যায়, সপ্তাহ যায়, নতুন বউ রান্না বান্না ভালই করছে, আচার-ব্যাবহারে স্বভাব-চরিত্রে পরিবারের সবাই খুব খুশী। শুধু শাশুড়ির কপালটাই সারাদিন কুঁচকে থাকে। মাঝে মধ্যে প্রতিবেশীদের কেউ হয়তো বলে বসেন, কি হে? নতুন বউকে নিয়ে তো প্রথম দিন অনেক কথাই বলেছিলে, তো সেই বউকে এখন কেমন মনে হচ্ছে? না জেনে কারো সম্পর্কে খারাপ বলা কি ঠিক? এরকম কথা শুনলেই তিনি তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। বলেন, আমি আবার কখন বললাম যে সে খারাপ? কক্ষনো বলিনি। আমি তো বরাবরই বলেছি যে আমি ঠিক জানিনা সে কেমন। প্রমান করতে পারবে যে আমি তাকে খারাপ বলেছি? ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁর অগ্নিমূর্তি দেখে প্রতিবেশীরা আর কথা না বাড়িয়ে মানে মানে কেটে পড়েন। তাঁর এরকম কথা-ঘুরিয়ে-পিছলে-যাওয়া স্বভাব সম্পর্কে প্রতিবেশীরা ভাল ভাবেই অবগত।

পাড়া গাঁয়ের শাশুড়ির এই পিছলা স্বভাবটাকে রীতিমত শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন একজন। তাঁকে আমরা ‘বিশ্ববেহায়া’ নামেই বেশী চিনি। বাইন-মাছ-গিরি করার লাইনে মউদুদকেও তিনি অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছেন। এটাই তাঁর নিয়তি, এভাবেই বগলে মাদুর নিয়ে তাঁকে ঘুরতে হবে, দর কষাকষি করে যতটুকু যা পায় সেটাই লাভ। এটা ঠিক যে তিনি পিছলাতে গিয়ে মাঝে মধ্যে দায় ঠেকে একটু আধটু ভালো কাজও করে থাকেন বটে, কিন্তু তাঁকে আমি মোটেই বিশ্বাস করিনা। যাহোক, এই ভদ্রলোককে নিয়ে আমি খুব একটা বেশী চিন্তিত নই। ইদানিং আশে-পাশে বেশ কিছু উদীয়মান বাইন-মাছ দেখতে পাচ্ছি। আমার দুঃশ্চিন্তা এঁদেরকে নিয়ে। এরা মনে করে, যন্ত্রের ভাষার মত, বাক্যের মধ্যেকার শব্দগুলিই সব। এ ছাড়াও পরিবেশ-পরিপ্রেক্ষিত-পরিবেশনা-বলার ভঙ্গি ইত্যাদির মাধ্যমে যে ভাব প্রকাশ হয় সেটা তাঁরা সচেতনভাবে প্রয়োজন মাফিক অস্বীকার করে থাকেন। যেখানে সেখানে যখন তখন দুম করে একটা নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে বসেন। কখনও কখনও প্রসঙ্গের অনেক বাইরে গিয়েও মুখস্ত গান গাইতে থাকেন। তারপরে কেউ ভুলটা ধরিয়ে দিলে সেই একই সুরে ধমকে ওঠেন, আমি কি বলেছি যে সে খারাপ? আমি তো বলেছি যে আমি জানতাম না! তারপরে দিব্যি বাইন মাছের মত পিছলে পিছলে চলে যান। এঁদের শিক্ষা-দীক্ষা কিম্বা বুদ্ধি-শুদ্ধি নিয়ে আমার একেবারেই কোনো সন্দেহ নেই, সন্দেহ তাঁদের উদ্দেশ্য নিয়ে। আর এখানেই আমার ভয়। এক বিশ্ববেহায়া কে নিয়েই যে ভোগান্তি, সেখানে আগামী দিনগুলোতে এঁরাই যখন ঝাঁকে ঝাঁকে আসবে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমাজকে নেতৃত্ব দেবে তখন কি যে হবে তা একমাত্র উপর ওয়ালাই জানেন।

Posted on November 19, 2013, in Uncategorized. Bookmark the permalink. 1 Comment.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

<span>%d</span> bloggers like this: