বাঙালী / বাংলাদেশী

আমার অগ্রজপ্রতিম মামুন ভাই তাঁর ফেসবুকে নিচের স্ট্যাটাসটি দিয়েছিলেন –

আমার জাতি সত্ত্বা বাঙ্গালী থেকে বাংলাদেশী হওয়াতে আমার নাগরিক অধিকারের কি হেরফের হয়েছে? পরিবর্তনের এই ৩৭ বছরে কি প্রভাব ফেলেছে? কি পেয়েছি? ভাষাভিত্তিক যে জাতীয়তাবোধের উন্মেষের ফলে নিজেদেরকে এক আলাদা জাতি হিসাবে ভাবতে পেরেছিলাম… স্বাধীনতা অর্জনে যা ধাপভিত্তিক আন্দোলনের প্রধান নিয়ামক ছিল, তাকে সরিয়ে নতুন জাতি সত্ত্বা কি এতোই জরুরী ছিল? এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের এক মোক্ষম অস্ত্র ছিল কি?

 

সেখানে একজন মন্তব্য করেছেন –

মামুন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলেও তাঁর পিছনের সেই উদ্দেশ্য কিন্তু অযৌক্তিক নয়। বাংলাদেশ স্বাধীনের পরে আমাদের জাতীয়তা ছিল ‘বাঙালি’। আবার পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ও বাঙালি ছিল… দুইটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের একই জাতি-সত্তা, একটু কেমন লাগে না? তখন লিখতে হতো এভাবে- ‘ ভারতীয় বাঙালি’ এবং বাংলাদেশী বাঙালি’। এই উদ্ভুত সমস্যা থেকেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আমাদের জাতীয়তা ‘বাঙ্গলাদেশী’তে কনভার্ট করেছিলেন। এটাকে অন্যকোনোভাবে না দেখাটি ই ভালো। অবশ্য এটা আমার নিজস্ব অভিমত।” (মন্তব্যকারী ভদ্রলোক আমার পরিচিত কেউ নন বিধায় বিনানুমতিতে তাঁর নাম/পরিচয় উল্লেখ করিনি)

 
দুটো বক্তব্য পড়ার পরে মনে হল কিছু একটা লিখি। আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র নই। তবু মনে হল এব্যাপারে আমার অভিমত গুলো লিখে রাখি। তাই লিখলাম –

 

মামুন ভাই, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে আপনার তো এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ থাকার কথা না। এটি নিঃসন্দেহে একটি অযৌক্তিক এবং বদ উদ্দেশ্য প্রসূত অপরাজনৈতিক চাল ছিল। আমার যুক্তিসমুহ বলছি, কোথাও ভুল হলে শুধরে দেবেন। এই অপকর্মকে জায়েজ করার জন্য গত চার দশক যাবত দুইটা অজুহাত ব্যাপক ভাবে প্রচার করা হচ্ছে। প্রথমটি হল পশ্চিম বঙ্গের অধিবাসীরাও বাঙালী, আর দ্বিতীয়টি হল বাংলাদেশে অনেক অবাঙালী মানুষও বসবাস করেন। মন্তব্যকারী ভদ্রলোক এই প্রথম অজুহাতটাকেই যুক্তি হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর নিজস্ব অভিমত প্রকাশের অধিকারের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাচ্ছি যে, তাঁরটি সহ, দুটো যুক্তিই ভয়াবহ রকমের অসার এবং খোঁড়া। নীচের পয়েন্টগুলিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করছি –

১) পশ্চিমবঙ্গ কোন স্বাধীন দেশ নয়। সেখানকার অধিবাসীরা সবাই জাতিতে ইন্ডিয়ান। তাঁরা বাঙালী সম্প্রদায়, কিন্তু জাতি নয়। সব ভাষা সম্প্রদায়ের জাতি হবার গৌরব নেই। অনেক ক্ষেত্রেই এজন্য কিছু বাড়তি যোগ্যতার দরকার পরে। শ্রীলঙ্কার তামিল, পাকিস্তানের বালুচ, ইন্ডিয়ার অহমীয়া কিংবা বিহারী কিংবা গুজরাটি – এঁরা কেউ জাতি নয়। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে বাঙালী জাতিতে পরিনত হয়েছে, বাঙালীদের একটি দেশ হয়েছে। দেশটির নাম বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ নয়। বাঙালীদের দেশ – বাংলাদেশ।

২) পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের পাসপোর্টে বা কোন অফিসিয়াল ডকুমেন্টে জাতীয়তা বা নাগরিকত্বের ঘরে “বাঙালী” শব্দটা লেখা থাকে না, সেখানে থাকে ভারতীয় কিংবা ইন্ডিয়ান কিংবা হিন্দুস্থানী। কাজেই, দুটি স্বাধীন দেশের একই জাতি-সত্তা – কথাটি সঠিক নয়।

৩) পৃথিবীতে একমাত্র এবং একমাত্র বাংলাদেশের মানুষেরাই জাতিতে “বাঙালী”। পশ্চিমবঙ্গের ওঁরা “ভারতীয়-বাঙালী”, ৭৫ পূর্বে “বাঙালী জাতি” বলতে সবাই বাংলাদেশের মানুষদেরকেই বোঝাতো। আইরিশ জাতি বলতে সবাই রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের জনগণকে বোঝে, উত্তর আয়ারল্যান্ড কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী আইরিশদেরকে বোঝে না। বাঙালী জাতি বলতে বাংলাদেশের জনগণকে বুঝতে হবে, অন্য কোন দেশের বাঙালী সম্প্রদায়কে নয়। দুই দশকের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে আমরা নিজেদেরকে জাতি হিসাবে পরিচয় দেবার গৌরব অর্জন করেছিলাম। সেই গৌরবে ইন্ডিয়ান বাঙালীদের ভাগ বসানোর কোন অধিকার নেই। এমনকি তাঁরা যদি কখনও স্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ প্রতিষ্ঠা করতে পারে সেদিনও তাঁদেরকে জাতীয়তা বোঝানোর জন্য পশ্চিমবঙ্গীয় বা এই ধরনের কোন শব্দ খুঁজে বের করে সেটিকে ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশের জনগণই “বাঙালী জাতীয়তা” – র একমাত্র ন্যায্য দাবীদার।

৪) কেউ যদি আমাদের এই গৌরবে ভাগ বসাতে চায় তাহলে আমাদের উচিত সেটা প্রতিহত করা। সেখানে জেনারেল জিয়া করলেন সম্পূর্ণ উল্টোটা! আমাদের কষ্টার্জিত গৌরব, একান্ত নিজস্ব পরিচয়ই পাল্টে দিলেন? টিক্কা সাহেব একজন খান ছিলেন তাই আমি আমার সারনেম পরিবর্তন করে ফেলব? কাল যদি নবগঠিত তেলেঙ্গানা রাজ্যের জনগন ঢাকা নামের সেখানকার কোন গ্রামকে শহরে পরিনত করে সেই শহরকে তাঁদের রাজধানী বানায় তাহলে পরেরদিন থেকে আমরা বাংলাদেশের ঢাকা শহরের নাম পরিবর্তন করে ফেলব? জেনারেল জিয়া প্রতিবেশীর প্রতি এতই উদার ভাবাপন্ন ছিলেন? যখন জামদানি কিংবা ফজলি আমের ব্যবসা্ স্বত্ব ইন্ডিয়ার হাতে চলে যায় তখন আমরা সবাই উদ্বিগ্ন হই, ক্ষুব্ধ হই, প্রতিবাদ করি। অথচ সেই ইন্ডিয়ার একটি প্রদেশের কাছে যখন আমার জাতি-স্বত্ব ছেড়ে দেই তখন কিছু মানুষ সেটাকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেন। অথচ এই ঘরানার নেতা-নেত্রিদের মুখে আমরা দিনরাত ইন্ডিয়া বিরোধী কথার খই ফুটতে দেখি!

এবার দ্বিতীয় খোঁড়া যুক্তিটির প্রসঙ্গে আসি। বলা হয়ে থাকে যে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী চাকমা, মারমা কিংবা উর্দুভাষী বিহারীরা তো সাংস্কৃতিক পরিচয়ে বাঙালী নন। তাহলে তাঁদেরকে কেন বাঙালী হয়ে যেতে হবে? খুব সংক্ষেপে এর উত্তর হল, সাংস্কৃতিক পরিচয় আর জাতীয়তা এক জিনিস নয়। বিশদ ব্যাখ্যায় না গিয়ে ছোট একটা উদাহরন দেই। ফ্রান্সের সকল মানুষ কিন্তু ফ্রেঞ্চ নয়। সেখানে নানান জাতের-বর্ণের-ভাষার মানুষের বসবাস। আজ যদি আমি ফ্রান্সের নাগরিকত্ব লাভ করি তবে, সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্বিক ভাবে ঘোর বাঙালী এই আমারও জাতীয়তা হবে ফ্রেঞ্চ। ফ্রান্সিয়ান বা এই জাতীয় কিছু নয়। ফ্রান্সের মত ভাষাসংস্কৃতির উপরে ভিত্তিকরে গড়ে ওঠা প্রত্যেকটি দেশের ক্ষেত্রেই একই ব্যাপার ঘটে। একমাত্র ব্যাতিক্রম বাংলাদেশ – সেটা কোন স্বাভাবিক যুক্তিগ্রাহ্য কারনে হয়নি, হয়েছে এক সামরিক শাসকের বন্দুকের নলের খোঁচায়।

একটি বিশেষ ঘরানার মানুষদের কাছে, এই জেনারেল জিয়া যখন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সহ সকল অমুসলিম “বাংলাদেশী” দেরকে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে বাধ্য করেন তখন সেটা খুবই যুক্তিসঙ্গত মনে হয়, আর বাংলাদেশের অধিবাসী অবাঙালী দেরকে জাতীয়তার ঘরে “বাঙালী” শব্দটা লিখতে বললে বিরাট বড় দোষের কাজ বলে মনে হয়। জাতীয় পরিচয় বাঙালী হলে কারোর ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা সংস্কৃতির ওপরে কোন প্রকার আঘাত আসে না, কিন্তু একজন অমুসলিমকে আল্লাহর উপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখতে বাধ্য করা আর একজন মুসলমানকে মুরগি জবাই করার আগে শীবের নাম স্মরন করতে বলা – দুটোই একই মাত্রার অপরাধ। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কাছ থেকে এরকম কোন আচরণ একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে তিনি যেখানে “বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা” হিসাবে বহুল প্রচারিত, সেখানে তাঁর কাছ থেকে এহেন আচরণ একেবারেই অনাকাঙ্খিত।

কেবলমাত্র রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি এগুলি করেছিলেন। একজন অপরিচিত ভুঁইফোঁড় মানুষকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে কিছু সস্তা চটকদার বিকল্প নিয়ে হাজির হতে হয়। তিনি জয় বাংলায় লাথি মেরে জিন্দাবাদ কায়েম করেছেন, তিনি বেতার বাংলাকে রেডিও বাংলাদেশ করেছিলেন, তিনি ধর্ম নিরপেক্ষতাকে ছুঁড়ে ফেলে সবাইকে আল্লাহর উপর বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছেন। তিনি জাতীয় সংহতির নাম করে রাষ্ট্রের জন্মের বিরোধিতাকারীদেরকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি বাঙালী জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আবাদ করেছিলেন। পরম পরিতাপের বিষয় হল, পাকিস্তান নামের আধাসভ্য ও প্রায় ব্যার্থ একটি রাষ্ট্রের নীতি-আদর্শ ও আচরনের সাথে তাঁর এই সকল কাজ পুরোপুরি ভাবে মিলে যায়। আমি আশ্চর্য হই না।

একটি জাতিকে অনেক পদ্ধতিতেই তিলে তিলে ধ্বংস করা যায়। এদের অন্যতম একটি হল – প্রথমে তার মাথা কেটে ফেল, তারপরে বাকিদেরকে তাঁদের ইতিহাস ঐতিহ্য গৌরব ভুলিয়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাসহীন, আত্মমর্যাদাহীন ও বেওয়ারিশ বানিয়ে দাও এবং এরপরে তাঁদের নিজেদের মধ্যে আজীবন কামড়াকামড়ি করার মত পর্যাপ্ত রসদ সরবরাহ কর। পাকিস্তানিরা পালাবার আগে আমাদের বুদ্ধিজীবিদেরকে নির্মূল করার চেষ্টা করে গেছে। আর ৭৫ এর পর থেকে শহীদ জিয়া ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন আমাদেরকে ইতিহাস ঐতিহ্য ভুলিয়ে বেওয়ারিশ বানাতে। আর হাজারটা বিতর্কের জন্ম দিয়ে গেছেন, সাথে করে স্বাধীনতা পন্থীদের দমিয়ে রাজাকারপন্থীদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন যেন সমগ্র জাতি দুই শিবিরে ভাগ হয়ে অনন্তকাল কামড়াকামড়ি করতে থাকে।

আমি সব সময় নিজেকে বাঙালী বলে পরিচয় দেই। এরপরে কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে – ইন্ডিয়ান? ফ্রম কলকাতা? আমি বলি, তাঁরাও বাংলায় কথা বলে থাকেন বটে, কিন্তু তাঁরা তো ইন্ডিয়ান বাঙালী।আমি বাঙালীর দেশ – বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার পুর্ব পুরুষেরা সংগ্রাম করে বাঙালীদের জন্য একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়েছেন। ৭৫ এর পরে “বাংলাদেশী” জাতীয়তাবাদ চালু না হলে এতদিনে আর কোন বাঙালীকে এই প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হত না, এত ব্যাখ্যাও দিতে হত না। আমার পরিসরে আমি চালিয়ে যাচ্ছি, হয়ত আরও অনেকেই এরকমটি করে যাচ্ছেন। হয়ত একসময় কোন বাঙালীকে আর এই প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হবে না।

Posted on June 9, 2014, in বাঙালী, political. Bookmark the permalink. 1 Comment.

  1. পারভেজ

    ঘটনা সত্যি যে উদ্দেশ্যটা নিঃসন্দেহে ছিল অসৎ।
    আর এই যুক্তিগুলি খুবই ক্ষুরধার। ঐসব অসার কারনের জন্য নয় বরং লিগেসি বদলানোর জন্যই জাতিয়তা বদলানো হয়েছে। বাকিটা আই ওয়াশ যা অনেকে আজও বোঝে না বা না বোঝার ভান করে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

<span>%d</span> bloggers like this: