Monthly Archives: February 2016

জে(সিসি)নেসিস

Capture

জেসিসি সৃষ্টির আদি পর্বে ছাত্ররা সকলেই নিখাঁদ ক্যাডেট ছিল। তাহারা ক্রীড়া কৌশলে অতিশয় চৌকশ এবং পরিশ্রমী, কো-কারিকুলার কর্মকান্ডে অবলীলায় পারদর্শী, লেখাপড়াতে অনায়াসে ঈর্ষনীয় সাফল্যের অধিকারী। কিন্তু তাহারা ক্যাডেট, তাই তাহারা স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই ডিসিপ্লিন নামক শৃঙ্খলা ভাঙিতে সদা তৎপর। তৈজসপত্র গোছগাছ করিয়া রাখা কিংবা মনোযোগ সহকারে পড়াশুনা – উভয়েই তাহদের অতিশয় অনীহা। নিয়মানুবার্তিতা আর সময়ানুবর্তিতার প্রতি তাহদের ভয়াবহ ধরনের গোপন অবাঞ্ছা। ক্যাডেট মনোজগতের এহেন দৃঢ় অবস্থা পরিলক্ষণ পুর্বক কর্তৃপক্ষ ব্যপক দুশ্চিন্তায় পতিত হইলেন। তাঁহাদের এই দুর্ভাবনা দূরিকল্পে তাঁহারা বলিলেন, উহাদিগের মাঝে কতকজন ক্যাডেট সুবোধ হউক। অতঃপর ক্যাডেটদিগের এক তৃতীয়াংশ সহসাই সুবোধ হইয়া গেল। কর্তৃপক্ষ বলিলেন, ইহা উত্তম। এবং তখন হইতে পৃথিবীতে জেসিসিতে ক্যাডেটরা দুই প্রজাতিতে বিভক্ত হইয়া পড়িল – ক্যাডেট এবং সুবোধ ক্যাডেট।

সেই সকল সুবোধ ক্যাডেটগণ রাতারাতি দুষ্টামি পরিত্যাগ করিয়া তাঁহাদের দৈনন্দিন জীবনে নিয়মানুবার্তিতা আর সময়ানুবর্তিতার ব্যপক স্বাক্ষর রাখিতে লাগিলো। তাঁহারা পাট করিয়া চুল আঁচড়াইয়া নিপাট করিয়া বস্ত্রসজ্জাতে নিত্য অভ্যস্ত হইয়া গেল। সন্ধ্যা হইলেই বিজলি-বাতি জ্বালাইয়া পাঠ্যপুস্তক লইয়া নিবিড় অধ্যায়নে লিপ্ত হয়, এমনকি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কালেও সত্ত্বর প্রদীপ-বাতি প্রজ্বলন পুর্বক বিদ্যানুরাগ চর্চা চালাইয়া যায়। তাঁহারা তৈজসপত্র, ঘর-দুয়ার, এমনকি বারান্দা-আঙ্গিনাও সুচারুরূপে পরিপাটি করিয়া সাতিশয় দৃষ্টিনন্দন রূপে সাজাইয়া রাখিতে লাগিলো। কর্তৃপক্ষ বলিলেন, ইহা উত্তম।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সুবোধ ক্যাডেটদিগের মধ্যে কেমন এক প্রকার গোপন মনঃকষ্টে ভুগিবার স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশিত হইতে লাগিল। অবশেষে একদিন তাঁহারা কর্তৃপক্ষকে বলিল, ক্যাডেটগণ হরহামেশা সুবোধ ক্যাডেটদিগকে লইয়া ঠাট্টা তামাশা করিয়া বেড়ায়। তাহাদিগের এহেন বিরতিহীন জবরদস্ত উৎপাতে সুবোধ ক্যাডেটদিগের জীবন ক্রমশই ওষ্ঠাগত হইয়া উঠিতেছে। এমতাবস্থায় এই দুই প্রজাতির ক্যাডেটদিগকে পারস্পরিক সহাবস্থানে রাখিলে অচিরেই সকল সুবোধ ক্যাডেটগণ আবিষ্ট এবং প্রলুব্ধ হইয়া পুনরায় ক্যাডেটে রূপান্তরিত হইয়া যাইবে। তখন পাঁচ ব্যাটারির সেই বাঘা সাইজের চৌকিদারি টর্চ জ্বালাইয়া খুঁজিলেও জগত সংসারে আর কোন সুবোধ ক্যাডেটের সন্ধান পাওয়া যাইবে না। সব শুনিয়া কর্তৃপক্ষ বলিলেন, ইহা উত্তম নহে!

তখন সুবোধ ক্যাডেটদিগের এই যন্ত্রণা দূরীভূত করিবার তরে কর্তৃপক্ষ বলিলেন, উহাদের জন্য একটি হুনাইন হাউজ হউক।এবং হুনাইন হাউজ আবির্ভূত হইলো। কর্তৃপক্ষ বলিলেন, ইহা উত্তম।

কর্তৃপক্ষ তখন সুবোধ ক্যাডেটদিগকে বলিলেন, তোমরা তোমাদের বাকসো-পেটরা সমেত ঘর হইতে বাহির হইয়া আইসো। এবং যাও, দেখ, সেখানে রহিয়াছে তোমাদের জন্য প্রতিশ্রুত হুনাইন হাউজ! তোমরা যাও দলে দলে, এবং সেখানে বসবাস কর নিরুপদ্রবে। ইহা তোমাদিগের জন্য উত্তম।

কর্তৃপক্ষ দ্বারা এরূপে আদিষ্ট হইয়া সুবোধ ক্যাডেটগণ উচ্চস্বরে কর্তৃপক্ষের প্রশংসা বন্দনা করিতে করিতে দলে দলে ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিলো। তাঁহারা সুনামির জলের ন্যায় হুনাইন হাউজে প্রবেশ করিলো, এবং অতঃপর সেথায় সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো। কর্তৃপক্ষ বলিলেন, ইহাই উত্তম।।

 

ভূমিকা : 

কাহিনীটি পুরাতন নাছারা-পুরাণ (old testament) এর জেনেসিস ও এক্সোডাস পর্বের ছায়া অবলম্বনে রচিত।

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এ আমাদের জেক্সকাইটদের একটা গ্রুপে সেদিন ছোট ভাইদের সাথে হুনাইন হাউজ নিয়ে খোঁচা-খুঁচিময় বাৎচিত হচ্ছিল। উপরের ছবিটি সেই খুনসুটির চুম্বক অংশের স্ন্যাপ-শট। এরপরে হুনাইন হাউজের এক্স ক্যডেটদেরকে একটা “দাঁত-ভাঙা” জবাব দেবার প্রবল আগ্রহ অনুভব করতে লাগলাম। কলেজে থাকাকালে আমি ছিলাম বদর হাউজে। সেকালে হুনাইন হাউজের অধিবাসীদের প্রতি দুটি কারণে সাংঘাতিক রকমের ঈর্ষা অনুভব করতাম – এক) তাঁদের হাউজটা ছিল কলেজ মস্কের একেবারেই কাছে, তাই মাগরিবের পরে তাঁদেরকে খুবই অল্প পথ দৌড়াতে হত, দুই) তাঁদের হাউজের মেঝে ছিল ঝকঝকে মোজাইক করা, এমন মেঝেতে হাজারটা ফ্রন্টরোল দিলেও মনে কোন ক্ষেদ থাকার কথা না। মূলতঃ সেই অতীত ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে গিয়েই এই লেখাটা বানিয়ে ফেললাম।
এখানে আরেকটি তথ্য জানিয়ে রাখা ভালো। আমাদের ছয় বছরের ক্যাডেট জীবনে খায়বার হাউজকে একবার, বদর হাউজকে হ্যাট্রিকসহ তিনবার, এবং হুনাইন হাউজকে পরপর দুবার চ্যাম্পিয়ন হতে দেখেছি। আমরা চলে আসার পরে সেই একই ধারাবিহিকতায় হুনাইন হাউজও চ্যম্পিয়নশিপের হ্যাট্রিক পুর্ণ করেছিল।

এটি নেহায়েতই একটি স্যাট্যায়ার। আমাদের বন্ধুদের মাঝে “বদর-হাউজ-টাইপ” বলে একটা ট্যাগনেম প্রচলিত ছিল। এই টাইপের মানুষেরা সব কিছুই সিরিয়াস ভাবে নেয়, ট্রোল-স্যাট্যায়ার দেখলে সহসাই রেগে গিয়ে আমার ইউনির জব্বার ভাইয়ের মত করে বলে ওঠেন, “যে ফান শুনলি মানুষ রাইগে যায়, সিরাম টাইপির ফান তুমি করতি যাবা কেন!” এখানে বলে রাখা ভালো, এঁদের সবাই কিন্তু বদর হাউজের অধিবাসী নন। বরং বেশিরভাগই জীবনে বদর হাউজ চোখেও দেখেননি। আমার এই হুনাইন হাউজ সম্পর্কিত স্যাট্যায়ারটি পড়ে অফেন্ডেড হওয়ার অধিকার কেবলমাত্র এবং কেবলমাত্র সেই সকল “বদর-হাউজ-টাইপ” এর লোকেদের জন্য সংরক্ষিত।